
একটি রাত, যে রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, রহমতের দরজা খুলে দেন….এই রাতই শবে বরাত। অনেকেই শবে বরাত পালন করেন, কিন্তু ঠিক শবে বরাত কবে, কেন এই রাত গুরুত্বপূর্ণ, আর কী করা উচিত ও কী করা উচিত নয় এই বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানেন না অনেকেই!
তাই আজ আমি সংক্ষিপ্ত আকারে জানাবো ২০২৬ সালের শবে বরাতের হিজরি ও ইংরেজি তারিখ, এই দিনে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ের সহজ ব্যাখ্যা এবং সংখ্যাগত তথ্য ও অজানা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট!
শুরুতে হিজরি তারিখের ব্যাপারে বলি। মূলত শবে বরাত হয় শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে। অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ সূর্যাস্তের পর এবং শাবান ১৫ তারিখ ফজর পর্যন্ত এই সময়টাই শবে বরাতের রাত।
আর যদি জানতে চান শবে বরাতের ইংরেজি তারিখ কীভাবে নির্ধারিত হয় তবে বলবো এটা ইসলামি ক্যালেন্ডার চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। যার কারণে শবে বরাতের ইংরেজি তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়। মোটকথক বাংলাদেশে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে তারিখ একদিন আগে বা পরে হতে পারে।
যেমন ধরুন যদি শাবান মাস শুরু হয় ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তাহলে শবে বরাত হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোর পর্যন্ত। তাই শবে বরাতের সঠিক ইংরেজি তারিখ জানতে সবসময় চাঁদ দেখার ঘোষণা অনুসরণ করতে হয়।
শবে বরাত শব্দ দুটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। শব = রাত, বরাত = মুক্তি / নাজাত। এর অর্থ হলো মুক্তির রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করেন, রিজিক নির্ধারণ করেন এবং ভবিষ্যতের অনেক ফয়সালা লিপিবদ্ধ করেন
হাদিস থেকে জানা যায় “শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন ‘কে আছো ক্ষমা চাইবে? আমি ক্ষমা করে দেব।’” তাছাড়া এই ক্ষমার দরজা সারা রাত খোলা থাকে.. মানে সূর্যাস্ত থেকে ফজর পর্যন্ত।
১. নফল নামাজ আদায়: শবে বরাতে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া উত্তম। কারণ নফল নামাজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। এক্ষেত্রে ২ রাকাত করে পড়া ভালো। যদিও ইসলামে নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা নেই মানে ১০, ১২ বা ১০০ রাকাত…কোনোটাই ফরজ নয়। তবে কম হলেও মনোযোগসহ নামাজ পড়াই উত্তম।
২. দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা: মনে রাখবেন শবে বরাতের এই রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর দুআ করার সময় আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ, সুস্থতা, হালাল রিজিক এবং পরিবার ও উম্মাহর কল্যাণ চাইবেন। পাশাপাশি একবার নয়, বারবার দোয়া করুন। কারণ এই রাতে আল্লাহ পাক বারবার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দেন।
৩. জিকির ও তাসবিহ পাঠ: আমরা সকলেই জানি জিকির মানে আল্লাহকে স্মরণ করা। কারণ জিকির অন্তরকে পরিষ্কার করে এবং গুনাহ কমায়। শবে বরাতের রাতে আপনি জিকির হিসাবে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তে পারেন। আর সহজ নিয়ম হিসাবে প্রতিটি জিকির কমপক্ষে ১০০ বার পড়ার চেষ্টা করতে পারেন।
৪. কুরআন তিলাওয়াত: শবে বরাতে কুরআন পড়া কিন্তু খুবই ফজিলতপূর্ণ। কারণ কুরআন হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর রহমত ডেকে আনে। এই রাতে কুরআন শরীফ এক পৃষ্ঠা পড়লেও সমস্যা নেই! এখানে নিয়মিত ও মনোযোগটাই আসল।
৫. পরদিন রোজা রাখা: শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখা মুস্তাহাব। আমাদের নবীজি (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন। এটি ফরজ নয়! কিন্তু সওয়াবের কাজ।
এই রাতে আতশবাজি, ফানুস, উৎসব করা পুরোপুরি নিষেধ। কারণ ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। এসব কাজ অর্থ ও সময়ের অপচয় এবং অন্যের ক্ষতির কারণ। পাশাপাশি এ সময় কবর জিয়ারত করা জায়েজ। কিন্তু মৃত ব্যক্তির কাছে দোয়া চাওয়া হারাম ও শিরক।
তাছাড়া শবেরাতের রাতে নির্দিষ্ট ইবাদতকে বাধ্যতামূলক মনে করা নাজায়েজ। কারণ আমাদের ধর্ম ইসলাম সহজ! চাপিয়ে দেওয়া নয়! সবশেষে বলবো সারারাত অহেতুক কাজে কাটানো চিন্তা ভুলেও করবেন না। মনে রাখবেন শবে বরাত একটি আত্মশুদ্ধির সময়।
ইতি কথা
হাদিস অনুযায়ী এই রাতে আল্লাহ তাআলা চার শ্রেণির মানুষকে ক্ষমা করেন না। এরা হলেন শিরককারী, হিংসাকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং মদ্যপ ব্যক্তি! তাই শুধু ইবাদত নয়, মন পরিষ্কার করাও জরুরি।
তাছাড়া আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে শবে বরাত কোনো আনন্দ উৎসব নয়! এটি আত্মশুদ্ধির রাত। এই রাতে আমরা যদি সত্যিকারভাবে তওবা করি, আল্লাহর দিকে ফিরে যাই তাহলেই শবে বরাতের প্রকৃত অর্থ পূরণ হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই রাতের বরকত ও ক্ষমা দান করুন, আমিন।