
আপনার বয়স বেশি, তাই এখন স্কলারশিপ পাওয়াটা অনেক কঠিন। এই কথাটা শুনে কত স্বপ্ন যে নীরবে কবর হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু আসল সত্যটা হলো বয়স বেশি মানেই স্কলারশিপ অসম্ভব নয়। কারণ সমস্যা বয়সে না, সমস্যা ভুল ধারণা আর ভুল প্রস্তুতিতে।
তাই আমাদের এই লেখাটি তাদের জন্য, যারা মনে করেন এইচএসসি পাসের পর গ্যাপ হয়েছে, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বয়স বেড়ে গেছে, চাকরি করতে করতে পড়াশোনার স্বপ্নটা ভেঙে গেছে। আজ আমরা পরিষ্কারভাবে জানবো বয়স বেশি হলেও স্কলারশিপে কিভাবে আবেদন করবেন, এ ব্যাপারে যুক্তি, বাস্তবতা এবং অজানা তথ্য।
বেশিরভাগ মানুষ ভাবে স্কলারশিপ মানেই ১৮ থেকে ২২ বছরের স্টুডেন্টদের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই আলাদা। বিশ্বের বেশিরভাগ স্কলারশিপ প্রোগ্রাম বয়সের চেয়ে দেখে আপনি কেন আবার পড়তে চান, এই পড়াশোনা আপনার ক্যারিয়ারে কী পরিবর্তন আনবে, আপনার অভিজ্ঞতা সমাজ বা দেশকে কীভাবে উপকার দেবে।
অর্থাৎ, বয়স নয় বরং এখানে আপনার গল্পটাই আসল। তাছাড়া দেখা যায় অনেক আন্তর্জাতিক স্কলারশিপে ৩০, ৩৫ এমনকি ৪০ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরাও নিয়মিতভাবে নির্বাচিত হচ্ছে।
স্কলারশিপে আবেদন করার জন্য যেটাকে আপনি দুর্বলতা ভাবছেন, সেটাই আসলে আপনার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট। কারণ লজিক্যালি বয়স বেশি মানে আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে, আপনি জানেন কেন পড়তে চান, আপনি দায়িত্বশীল এবং আপনার লক্ষ্য স্পষ্ট।
তাছাড়া স্কলারশিপ কমিটি আসলে এমন মানুষই খোঁজে, যারা ডিগ্রি নিয়ে শুধু সিভি ভারী করবে না। বরং বাস্তবে কিছু করবে। আর একজন ২৮ বা ৩২ বছর বয়সী আবেদনকারী যদি পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারে, এই পড়াশোনা শেষে কী করবে তাহলে সে অনেক কম বয়সী কিন্তু কনফিউজড আবেদনকারীর চেয়েও এগিয়ে থাকবে।
বয়স বেশি হলে আবেদন করার সময় যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো বয়স না লুকানো। সবচেয়ে বড় ভুল হয় এখানেই! অনেকে বয়স লুকাতে চায়। কিন্তু এই গ্যাপ আর ব্যাখ্যা করতে চায় না। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ এখানে বয়স বা গ্যাপ লুকানো নয়, ব্যাখ্যা করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
আপনাকে পরিষ্কার করে বলতে হবে এই সময়টাতে আপনি কী কী শিখেছেন, চাকরি, পরিবার, ব্যবসা বা নিজের উন্নয়নে কী করেছেন, এই অভিজ্ঞতা আপনার পড়াশোনাকে কীভাবে আরো হেল্প করবে। যখন আপনি আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের সময়টাকে ব্যাখ্যা করবেন, তখন দেখবেন কতৃপক্ষের বয়স নিয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
এখানেই আসল খেলাটা। আপনার SOP বা Statement of Purpose যদি শুধু ডিগ্রি আর রেজাল্টের গল্প হয়, তাহলে বয়স সমস্যা হবে। কিন্তু যদি আপনার SOP হয় জীবনের গল্প তাহলেই আপনার বয়স হয়ে উঠবে আপনার শক্তি।
সোপে আপনাকে দেখাতে হবে আপনি কেন আগে পড়তে পারেননি, কেন এখন পড়াটা আপনার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এই ডিগ্রি আপনার দেশ, কমিউনিটি বা ক্যারিয়ারে কী প্রভাব ফেলবে। মনে রাখবেন স্কলারশিপ বোর্ড আবেগ নয়! বরং আপনার যুক্তি এবং লক্ষ্য দেখতে চাইবে।
শুরুতে বলে রাখি সব স্কলারশিপ বয়সভিত্তিক নয়। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান স্কলারশিপ, ইরাসমাস, তুরস্ক বুরসলারি, চীনা সরকারি স্কলারশিপ, DAAD, কানাডা ও ফিনল্যান্ডের অনেক প্রোগ্রাম এগুলোতে বয়সের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় আপনার প্রোফাইল আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে work experience থাকলে বয়স বাড়লেও আবেদন আরও স্ট্রং হয়।
জানেন এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা স্কলারশিপ বোর্ড না, সমস্যা আমরা নিজেরাই। আমরা নিজেরাই ভাবি এখন আর সময় নেই, লজ্জা লাগবে, আমার বয়সের লোকেরা কি আবার স্টুডেন্ট হয়। অথচ বাস্তবতা হলো বিদেশের ক্লাসরুমে বয়স নিয়ে কেউ হাসে না। সেখানে গুরুত্ব পায় আপনার চিন্তা, কাজ আর আইডিয়া।
মনে রাখবেন বয়স নয়! বরং মন থেকে স্কলারশিপে আবেদন করার জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় হলো “আমি পারবো না” ভাবার বয়স। অনেক স্কলারশিপ রিসিপিয়েন্ট আছেন যারা ৩০ বছর বয়সে মাস্টার্স শুরু করেছেন, ৩৫ বছরে আবার ব্যাচেলর করেছেন। অনেকে আবার চাকরি ছেড়ে ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছেন। কারণ তারা একটাই কাজ করেছেন এবং সেটা হলো নিজেদের বয়সকে লুকাননি! বরং শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।