বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বনাম ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বনাম ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে: পূর্ণ বিশ্লেষণ

প্রবাস প্রতিদিন
আপডেটঃ : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বনাম ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে: পূর্ণ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বনাম ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে: পূর্ণ বিশ্লেষণ.jpg

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে আলোচনা হলেই সমাজ সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল মনে করে, অল্প বয়সে বিয়ে মানেই ধর্মীয়ভাবে ভালো। কারণ ইসলাম নাকি কম বয়সে বিয়েকে উৎসাহ দেয়।

আবার অন্যদল মনে করে, অল্প বয়সে বিয়ে মানেই অন্যায়, ক্ষতি, এবং জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু সত্য কথা হলো, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির কোনোটাই পুরোপুরি সঠিক নয়, যদি না আমরা বিষয়টিকে গভীরভাবে বুঝি। কারণ বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে আর ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে এই দুইটি বিষয় এক নয়।

ইসলাম বিয়েকে ইবাদত হিসেবে মর্যাদা দেয়। কিন্তু সেই বিয়ের মধ্যে যদি অন্যায়, জোরজবরদস্তি, মানসিক অপ্রস্তুতি, আর্থিক অক্ষমতা, কিংবা শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই বিয়ে আর কল্যাণের পথ থাকে না। বরং তা হয়ে উঠতে পারে কষ্ট, ভাঙন, এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুতাপের কারণ।

তাই আজ আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ের বাস্তবতা কী, ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে আসল শিক্ষা কী, কোথায় সমাজ ধর্মকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে, এবং কেন এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা মারাত্মক ভুল।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে সমাজের বাস্তবতা না ধর্মের সঠিক প্রয়োগ?

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বহু বছর ধরে একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। শহরাঞ্চলে এটি কিছুটা কমলেও গ্রামাঞ্চল, দরিদ্র পরিবার, এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক অঞ্চলে এটি এখনো একটি কঠিন সত্য। অনেক পরিবার মনে করে, মেয়ের বয়স একটু বাড়লেই সমস্যা বাড়ে। কেউ ভয় পায় সমাজ কী বলবে, কেউ ভয় পায় মেয়ের নিরাপত্তা, কেউ আবার ভাবে, দরিদ্র সংসারে মেয়েকে যত দ্রুত বিয়ে দেওয়া যায়, ততই ভালো। এই মানসিকতা ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে বিয়ে আর জীবন গড়ার পবিত্র সিদ্ধান্ত থাকে না। বরং হয়ে যায় চাপ কমানোর উপায়।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ের বড় একটি কারণ হলো অর্থনৈতিক দুর্বলতা। অনেক বাবা-মা মনে করেন, মেয়ে যতদিন ঘরে থাকবে, ততদিন খরচ বাড়বে, দায়িত্ব বাড়বে, আর সমাজের চোখে চাপও বাড়বে। ফলে তারা দ্রুত বিয়েকে সমাধান ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে এই সমাধান অনেক সময় আরও বড় সমস্যার জন্ম দেয়।

যে মেয়ে এখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শেখেনি, নিজের ভবিষ্যৎ বুঝে উঠতে পারেনি, নিজের শরীর ও মন সম্পর্কে পরিপক্ব হয়নি, তার ওপর স্ত্রী, পুত্রবধূ, এমনকি মা হওয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। এটি শুধু একটি বিয়ে নয়। বরং এটি প্রায়ই একটি অসময়ে চাপিয়ে দেওয়া জীবনব্যবস্থা।

অনেক সময় পরিবার ধর্মের নাম ব্যবহার করে নিজেদের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বলে, ইসলামে তো কম বয়সে বিয়ে আছে। কিন্তু তারা খুব কমই বলে, ইসলামে দায়িত্বহীন বিয়ে নেই, জোর করে বিয়ে নেই, ক্ষতির বিয়ে নেই, সম্মতি ছাড়া বিয়ে নেই। আর অন্যায়কে ধর্মের মোড়ক পরিয়ে দেওয়ার অনুমতিও নেই। ফলে বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় চেতনার প্রকাশ নয়। বরং সামাজিক সমস্যার ধর্মীয় ভাষায় সাজানো একটি সংস্করণ।

ইসলামে অল্প বয়সে বিয়েতে বয়স নয় বরং প্রস্তুতি ও দায়িত্বের গুরুত্ব

ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি হলো অনেকে মনে করে ইসলাম শুধু বয়স কম হলেই বিয়েকে ভালো মনে করে। অথচ ইসলাম বিয়েকে কখনোই শুধুমাত্র বয়সের সাথে বেঁধে দেয়নি।

ইসলাম বিয়েকে একটি দায়িত্বপূর্ণ অঙ্গীকার, একটি সামাজিক চুক্তি, একটি নৈতিক সম্পর্ক, এবং একটি ইবাদত হিসেবে দেখে। তাই এখানে কেবল শরীর বড় হলেই বিয়ে নয়। বরং মন, বুদ্ধি, দায়িত্ববোধ, সামর্থ্য, এবং নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা এসবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের মধ্যে কয়েকটি মূল বিষয় আছে।

  • প্রথমত, দুই পক্ষের সম্মতি।
  • দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা।
  • তৃতীয়ত, ভরণপোষণের সামর্থ্য।
  • চতুর্থত, ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকা।
  • পঞ্চমত, সম্পর্কের মধ্যে ন্যায় ও দয়া বজায় রাখার ক্ষমতা।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন ছেলে বা মেয়ে যদি বয়সে ছোট হয়, কিন্তু বাস্তবে এই দায়িত্বগুলো নিতে অক্ষম হয়, তাহলে কেবল অল্প বয়স থাকার কারণে কি সেই বিয়ে আদর্শ হয়ে যায়? উত্তর হলো না।

ইসলামে বিয়ে সহজ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেই সহজ করার অর্থ দায়িত্বকে হালকা করা নয়। ইসলাম ব্যভিচার, নৈতিক অবক্ষয়, এবং সমাজে অশ্লীলতা কমাতে বিয়েকে উৎসাহ দেয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, যে কেউ, যে কোনো বয়সে, যে কোনো পরিস্থিতিতে বিয়ে করলেই তা প্রশংসনীয় হবে। বরং যদি বিয়ের কারণে একজন মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানসিক স্থিতি, বা নিরাপত্তা নষ্ট হয়, তাহলে সেই বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতেও কল্যাণকর বলা যায় না।

অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে গেলে প্রথমে আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কার করতে হবে এবং সেটি হলো ইসলাম কোনো কাজকে শুধু ইতিহাসের উদাহরণ দিয়ে নয়! বরং নীতির আলোকে বিচার করে। অতীতে কোনো সমাজে কোনো বয়সে বিয়ে হয়েছে মানেই আজকের প্রতিটি সমাজে, প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি পরিস্থিতিতে তা একইভাবে প্রয়োগ করতে হবে এমন চিন্তা ইসলামি প্রজ্ঞার সঙ্গে মেলে না।

ইসলাম একটি সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা। তাই এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের সংস্কৃতি নয়! বরং ন্যায়, দয়া, কল্যাণ, নিরাপত্তা, সম্মান, এবং দায়িত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি নীতিনির্ভর ব্যবস্থা। সুতরাং, আজ যদি একটি সমাজে অল্প বয়সে বিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়, মানসিকভাবে ভেঙে দেয়, আর্থিক নির্ভরতা বাড়ায়, এবং পরিবারে নির্যাতনের সম্ভাবনা তৈরি করে তাহলে সেই বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধু ধর্মে আছে বলা এক ধরনের অর্ধসত্য।

ইসলাম কখনো অর্ধসত্যকে সমর্থন করে না। ইসলাম চায় না, কেউ ধর্মের নামে এমন কিছু করুক যা শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপর জুলুম হয়ে দাঁড়ায়। তাই অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে ইসলামি আলোচনা করার সময় শুধু বিয়ের অনুমতি নয়, বিয়ের উদ্দেশ্যও বুঝতে হবে।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের কারণ

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের কারণ অনেক গভীর এবং বহুস্তরীয়। এটি শুধু একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়! বরং সমাজ, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সংস্কার, এবং লিঙ্গভিত্তিক মানসিকতার সঙ্গে জড়িত একটি বড় সমস্যা। অনেক পরিবার তাদের মেয়েকে ভালোবেসেই অল্প বয়সে বিয়ে দেয় এ কথাটিও আংশিক সত্য। কিন্তু সেই ভালোবাসা অনেক সময় ভয়, অজ্ঞতা, এবং সামাজিক চাপে গড়ে ওঠা এক ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত।

দরিদ্র পরিবারে মেয়ে সন্তানকে প্রায়ই অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখা হয়। তার পড়াশোনা, নিরাপত্তা, পোশাক, যাতায়াত, সামাজিক মর্যাদা সবকিছু মিলিয়ে পরিবারের মনে হয়, যত দ্রুত বিয়ে দেওয়া যায়, তত ভালো। আবার অনেক জায়গায় কিশোরী মেয়েকে ঘরে রাখাকে ঝুঁকি মনে করা হয়। কেউ ভয় পায় প্রেম হবে, কেউ ভয় পায় সমাজে বদনাম হবে, কেউ ভয় পায় যৌন হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতা। এই ভয়গুলো বাস্তব হলেও সমাধান হিসেবে বিয়ে বেছে নেওয়া সবসময় সঠিক নয়।

আরেকটি বড় কারণ হলো কুসংস্কার। অনেক মানুষ এখনো মনে করে, মেয়ের বয়স বাড়লে ভালো পাত্র পাওয়া কঠিন হয়। কেউ ভাবে, কম বয়সে বিয়ে হলে মেয়ে বেশি মানিয়ে নিতে পারে। এই ধারণাগুলো শুধু অন্যায্য নয়, বিপজ্জনকও।

ইসলামে বিয়ের শর্ত

ইসলামে বিয়ের শর্ত বুঝতে না পারার কারণেই অনেক ভুল সিদ্ধান্তকে মানুষ ধর্মীয় বলে চালিয়ে দেয়। ইসলামি বিয়ের মধ্যে শুধু নিকাহর বাক্য বা আনুষ্ঠানিকতা নেই। এর মধ্যে আছে অধিকার, দায়িত্ব, সম্মান, নিরাপত্তা, এবং পারস্পরিক ন্যায়বিচার।

প্রথমত, সম্মতি। কোনো মেয়ে বা ছেলেকে জোর করে বিয়ে দেওয়া ইসলামি দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারো নীরব কান্না, ভয়, বা চাপা আপত্তিকে সম্মতি ধরে নেওয়া এক ধরনের অন্যায়।

দ্বিতীয়ত, সামর্থ্য। একজন পুরুষ যদি ভরণপোষণ, নিরাপত্তা, এবং সংসারের মৌলিক দায়িত্ব নিতে অক্ষম হয়, তাহলে শুধু আবেগ দিয়ে বিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না।

তৃতীয়ত, পরিপক্বতা। বিয়ে শুধু একসাথে থাকা নয়। এটি সম্পর্ক বুঝতে পারা, রাগ সামলানো, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, অধিকার মানা, এবং কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরার নাম। এই গুণগুলো না থাকলে বিয়ে দ্রুত কষ্টের জায়গা হয়ে যায়।

চতুর্থত, কল্যাণ। ইসলাম এমন কোনো সম্পর্ককে আদর্শ বলে না, যা বাস্তবে ক্ষতির কারণ হয়। যদি কোনো বিয়ের ফলে শারীরিক ক্ষতি, মানসিক ভাঙন, শিক্ষার ধ্বংস, আর্থিক নির্ভরতা, বা অন্যায় বাড়ে, তাহলে সেই বিয়ে শুধু হয়েছে বলেই ভালো হয়ে যায় না। ইসলামি বিচার শুধু কাজের বাইরের রূপ দেখে না; তার ভেতরের প্রভাবও দেখে।

এ কারণেই ইসলামে বিয়ের শর্ত শুধু বয়সের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো এই বিয়ে কি সত্যিই দুইজন মানুষকে নিরাপদ, সম্মানজনক, এবং দায়িত্বশীল জীবনে নিয়ে যাবে? যদি উত্তর না হয়, তাহলে সেখানে ইসলামি আদর্শ পূর্ণ হয় না।

অল্প বয়সে বিয়ে ও ইসলাম

অল্প বয়সে বিয়ে ও ইসলাম এই দুইটি শব্দ একসাথে আসলেই সমাজে এক ধরনের আবেগ তৈরি হয়। কেউ ধর্ম রক্ষার নামে কথা বলে। কেউ মানবাধিকারের ভাষায় প্রতিবাদ করে। কেউ আবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিভ্রান্ত হয়। কিন্তু সমাজের বড় ভুল হলো, তারা ইসলামের নাম উচ্চারণ করলেও ইসলামের ন্যায়বিচার, দয়া, এবং দায়িত্বের শিক্ষা ভুলে যায়।

প্রথম ভুল হলো শুধু বিয়ে কে দেখা, বিয়ের পর জীবনকে না দেখা। একটি বিয়ে হলো শুরু, শেষ নয়। কিন্তু অনেক পরিবার শুধু নিকাহ হয়ে গেলেই মনে করে দায়িত্ব শেষ। এরপর মেয়েটি কীভাবে থাকবে, সে পড়বে কি না, সে নিরাপদ কি না, তার মতামত কী, তার শরীর-মন প্রস্তুত কি না এসব আর গুরুত্ব পায় না।

দ্বিতীয় ভুল হলো মেয়ের নীরবতাকে সম্মতি ভাবা। সমাজে অনেক মেয়ে ভয়, লজ্জা, কিংবা পারিবারিক চাপে নিজের কথা বলতে পারে না। কিন্তু চুপ থাকা মানেই রাজি থাকা নয়।

তৃতীয় ভুল হলো ছেলের অক্ষমতাকে উপেক্ষা করা। অনেক অল্পবয়সী ছেলে নিজেই জীবনের দিশা জানে না, কিন্তু তাকে স্বামী, উপার্জনকারী, এবং অভিভাবকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে সে নিজেও ভেঙে পড়ে, সম্পর্কও ভেঙে যায়।

চতুর্থ ভুল হলো ধর্মকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা, কিন্তু ধর্মের ন্যায়নীতি বাদ দেওয়া। যদি কোনো সিদ্ধান্তে ক্ষতি বেশি হয়, জুলুমের আশঙ্কা থাকে, শিক্ষা নষ্ট হয়, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে, এবং মানুষের জীবন ভেঙে যায় তাহলে সেটিকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার আগে হাজারবার ভাবা দরকার।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে ও আইন

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে ও আইন নিয়ে আলোচনা করাও জরুরি। কারণ একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং ন্যায়বিচারের কথা বিবেচনা করে আইন তৈরি করে। অনেক সময় মানুষ আইনকে শুধু বাধা হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তবে অনেক আইন সমাজের দুর্বল মানুষদের রক্ষা করার জন্য তৈরি হয় বিশেষ করে শিশু, কিশোরী, এবং আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়েকে নিরুৎসাহিত করার পেছনে বড় কারণ হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা। সমাজে দেখা গেছে, অল্প বয়সে বিয়ে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়ের জীবনই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার শিক্ষা থামে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, আর্থিক স্বাধীনতা কমে, পারিবারিক নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়ে, এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়। তাই আইন শুধু বয়সের সংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না! বরং সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামও ক্ষতি কমাতে চায়। যদি কোনো সমাজে একটি নির্দিষ্ট কাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে সেই সমাজে সতর্কতা, সীমাবদ্ধতা, এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ইসলামি প্রজ্ঞার বিরোধী নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি ন্যায় ও কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কম বয়সে বিয়ে কি সুন্নাহ?

কম বয়সে বিয়ে কি সুন্নাহ এই প্রশ্নটি অনেকেই খুব আবেগ নিয়ে করেন। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরও আবেগ দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে বুঝতে হবে। সুন্নাহ মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বাহ্যিক অনুসরণ নয়। বরং নববী শিক্ষার উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, ভারসাম্য, এবং কল্যাণকে অনুসরণ করা।

যদি কেউ শুধু কম বয়সকে সুন্নাহ মনে করে, কিন্তু দায়িত্ব, দয়া, নিরাপত্তা, সম্মতি, এবং কল্যাণকে উপেক্ষা করে, তাহলে সে সুন্নাহর রূপ ধরে রেখে সুন্নাহর আত্মাকে হারিয়ে ফেলছে। ইসলামি জীবনযাপন মানে শুধু কাজের বাহ্যিক নকল নয়। বরং আল্লাহভীতি, ন্যায়, দায়িত্ববোধ, এবং মানুষের হক রক্ষা করা।

সুতরাং, কম বয়সে বিয়ে নিজে নিজে কোনো জাদুকরী পুণ্যের কাজ নয়। যদি তা সঠিক প্রেক্ষাপটে, দায়িত্বশীলভাবে, নিরাপদভাবে, এবং উভয় পক্ষের কল্যাণে হয় তাহলে তা ভালো হতে পারে। আর যদি তা জোর করে, অজ্ঞতায়, ভয় থেকে, কিংবা ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয় তাহলে শুধু কম বয়স থাকার কারণে সেটি মহৎ হয়ে যায় না।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বনাম ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে

এখন মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক! বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে বনাম ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে এই দুইয়ের মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায়?

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক সময় হয় ভয় থেকে। ইসলামি বিয়ে হওয়া উচিত সচেতনতা থেকে। বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক সময় হয় চাপ থেকে। ইসলামি বিয়ে হওয়া উচিত সম্মতি থেকে।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক সময় হয় দারিদ্র্য থেকে পালাতে। ইসলামি বিয়ে হওয়া উচিত দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হয়ে। বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক সময় মেয়ের কণ্ঠ বন্ধ করে দেয়। ইসলামি বিয়ে হওয়া উচিত মেয়ের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে অনেক সময় জীবন থামিয়ে দেয়। ইসলামি বিয়ে হওয়া উচিত জীবনকে হালাল, শান্ত, এবং ভারসাম্যপূর্ণ পথে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম।

এই তুলনা থেকেই স্পষ্ট হয় যে দুইটিকে এক করে দেখা ভুল। ইসলাম কখনো সমাজের সব ভুল সিদ্ধান্তের দায় নেবে না। মানুষ অনেক সময় নিজের ভয়, কুসংস্কার, বা অন্যায়কে ধর্মের ভাষায় সাজায়। কিন্তু সাজিয়ে দিলেই তা সত্য হয়ে যায় না।

ইতি কথা

সবশেষে এক কথায় বলা যায় যে বাংলাদেশে অল্প বয়সে বিয়ে আর ইসলামে অল্প বয়সে বিয়ে একই বিষয় নয়। বাংলাদেশে যা অনেক সময় সামাজিক চাপ, দরিদ্রতা, ভয়, কুসংস্কার, এবং মেয়ের ওপর অন্যায্য দায়িত্ব চাপানোর ফল! ইসলামে বিয়ে হওয়া উচিত দায়িত্ব, সম্মতি, সামর্থ্য, পরিপক্বতা, নিরাপত্তা, এবং কল্যাণের ভিত্তিতে।

ইসলাম বিয়েকে সহজ করেছে, কিন্তু দায়িত্বকে হালকা করেনি। ইসলাম সম্পর্ককে পবিত্র করেছে, কিন্তু অন্যায়কে বৈধ করেনি। ইসলাম তরুণদের নৈতিকতা রক্ষার পথ দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের জীবন ভেঙে দেওয়ার পথ শেখায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ