
বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ব্যাংকে গিয়ে বললেন “ভাই, স্টুডেন্ট লোন আর স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে চাই।” ব্যাংকার যদি পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, “কোনটা চান?” তখন যেন মাথায় আকাশ ভেঙে না পড়ে সেজন্যই আমরা আজ আপনাকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সময় শিক্ষা ঋণ এবং স্টুডেন্ট ফাইল মধ্যে পার্থক্যটা বুঝিয়ে বলবো!
শিক্ষা ঋণ হলো পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ। বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই ঋণ ব্যবহার করে টিউশন ফি, ভর্তি-সংক্রান্ত খরচ, শিক্ষা ব্যয় বা নির্দিষ্ট অন্যান্য খরচ মেটানো যেতে পারে! তবে কোন খরচ ঋণের আওতায় থাকবে সেটা ব্যাংকের শর্তের ওপর নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ব্যাংক এশিয়ার স্টুডেন্ট সাপোর্ট লোন বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুবিধা দেখাচ্ছে।
তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাবা, মা বা অভিভাবক প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ আবেদনকারী বা গ্যারান্টার হতে পারেন এবং ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৯ বছর পর্যন্ত হতে পারে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট গ্রেস পিরিয়ডের ব্যবস্থাও আছে। অর্থাৎ এখানে ব্যাংক আপনাকে টাকা ধার দিচ্ছে। সেই টাকা আপনাকে পরবর্তীতে সুদসহ বা ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ফেরত দিতে হবে।
এবার আসি স্টুডেন্ট ফাইল-এর কথায়। স্টুডেন্ট ফাইল হলো বিদেশে পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশের শিক্ষার্থীর অনুমোদিত বিদেশি শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা। ব্যাংক এশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার অধীনে বিদেশে নিয়মিত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে টিউশন ফি, বোর্ডিং, থাকাখাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুমোদিত খরচ পরিশোধের জন্য স্টুডেন্ট ফাইল ব্যবহার করা হয়।
অর্থাৎ স্টুডেন্ট ফাইলের মূল কাজ হলো বাংলাদেশ থেকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা-সংক্রান্ত অনুমোদিত জায়গায় টাকা পাঠানোর ব্যাংকিং প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। এটা নিজে কোনো ঋণ নয়।
ধরুন আপনি যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স করতে যাচ্ছেন। আপনার প্রথম বছরের মোট খরচ ধরা যাক টিউশন ফি = ১২ লাখ টাকা, থাকা ও অন্যান্য খরচ = ৫ লাখ টাকা, অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ = ১ লাখ টাকা, অর্থাৎ মোট প্রয়োজন প্রায় ১৮ লাখ টাকা। আপনার পরিবারের নিজস্ব সঞ্চয় আছে ১০ লাখ টাকা। তাহলে ঘাটতি হলো ১৮ লাখ – ১০ লাখ = ৮ লাখ টাকা। এই ৮ লাখ টাকা আপনি কোনো উপযুক্ত শিক্ষা ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারেন, যদি ব্যাংকের যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করেন।
এখন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি বা অনুমোদিত অন্যান্য খরচ পাঠানোর সময় আপনার ব্যাংক স্টুডেন্ট ফাইলের মাধ্যমে সেই অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে। এখানে ৮ লাখ টাকার হিসাবে হচ্ছে শিক্ষা ঋণের! আর বিদেশে শিক্ষা-সংক্রান্ত অর্থ পাঠানোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা হচ্ছে স্টুডেন্ট ফাইলের!
স্টুডেন্ট ফাইল কোনো নির্দিষ্ট ধরনের সঞ্চয় নয় যে ফাইলে আগে থেকেই নিজের সব টাকা রাখতে হবে। মূল বিষয় হচ্ছে এর মাধ্যমে বিদেশে পড়াশোনার জন্য অনুমোদিত অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো। ব্যাংক এশিয়ার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্টুডেন্ট ফাইল খোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী বা তার বৈধ অভিভাবকের ব্যাংক হিসাবের সম্পর্ক থাকতে পারে! এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার, খরচের হিসাব, পাসপোর্ট, ভিসা, শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে! কিন্তু দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই জিনিস হয়ে যায় না। ধরুন ব্যাংক আপনাকে শিক্ষা ঋণ দিল। ব্যাংক কীভাবে সেই ঋণের টাকা ছাড়বে, কোথায় পাঠাবে এবং আপনার বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন কীভাবে পরিশোধ হবে এসব ব্যাংকের ঋণের শর্ত ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নিয়মের ওপর নির্ভর করবে। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি টাকা পাঠানোর প্রয়োজন হলে ব্যাংক আপনাকে স্টুডেন্ট ফাইল বা সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক অর্থপ্রদানের প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে বলতে পারে। তাই ঋণ নেওয়ার আগে ব্যাংককে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন “এই শিক্ষা ঋণের টাকা কি আমার স্টুডেন্ট ফাইলের মাধ্যমে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো যাবে?”
ব্যাংকভেদে কাগজপত্র কিছুটা আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণভাবে আপনাকে প্রস্তুত রাখতে হবে:
আর হ্যাঁ! পরবর্তী সেমিস্টারে টাকা পাঠানোর সময় আগের সেমিস্টারের পেমেন্ট রসিদ, ফলাফল বা ট্রান্সক্রিপ্ট এবং নতুন সেমিস্টারের ইনভয়েস লাগতে পারে। ব্যাংক এশিয়া তাদের প্রকাশিত স্টুডেন্ট ফাইল নির্দেশনায় এসব নথির কথা উল্লেখ করেছে। তাই প্রথমবার ফাইল খুলেই সব কাজ শেষ এমন মনে করবেন না।
অনেকে মনে করেন স্টুডেন্ট ফাইল হলো ভিসা! যা ভুল ধারণা! স্টুডেন্ট ফাইল কোনো ভিসা নয়। আপনাকে আপনার ভিসা দেবে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ। আর ব্যাংক স্টুডেন্ট ফাইলের মাধ্যমে আপনার বিদেশে পড়াশোনার অর্থপ্রদানের প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে!
উদাহারণ হিসাবে বলি! ধরুন আপনি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পেলেন। এরপর মোট টিউশন ও অন্যান্য খরচ হিসাব করলেন এবং নিজের সঞ্চয় কত আছে সেটা বের করলেন। সেই সাথে ঘাটতি কত তা নির্ধারণ করলেন। প্রয়োজন হলে শিক্ষা ঋণের জন্য আবেদন করলেন! ঋণ অনুমোদনের পর ব্যাংকের সঙ্গে অর্থ ছাড় ও ব্যবহারের নিয়ম বুঝলেন। এরপর বিদেশে পড়াশোনার জন্য স্টুডেন্ট ফাইল খুললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনভয়েস ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দিলেন! সবশেষে ব্যাংক প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে টাকা পাঠাল।
এটার কোনো একক নিয়ম নেই। আপনার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। যদি আপনার নিজের টাকা আগে থেকেই থাকে এবং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা পাঠাতে হয়, তাহলে স্টুডেন্ট ফাইল খোলার প্রয়োজন হতে পারে। যদি নিজের টাকা যথেষ্ট না থাকে, তাহলে শিক্ষা ঋণের প্রয়োজন হতে পারে। আর যদি লোন + নিজের টাকা মিলিয়ে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি দিতে হয়, তাহলে দুটো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমন্বয় দরকার হতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো হলো একই ব্যাংকের সঙ্গে দুই বিষয় নিয়ে একসঙ্গে কথা বলা। তাহলে ব্যাংক আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিষ্কার ধারণা দিতে পারবে।