
অনেক মানুষই একটি স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে যান পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন, নিজের একটি বাড়ি করবেন, ব্যবসা শুরু করবেন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য বড় অঙ্কের টাকা জমাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর বিদেশে কাজ করেও প্রত্যাশিত পরিমাণ টাকা জমাতে পারেন না।
মাসের শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, বেতন এসেছে ঠিকই, কিন্তু টাকা কোথায় গেল তা বোঝা যাচ্ছে না। যদি আপনিও এমন সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহলে এই গাইডটি আপনার জন্য।
প্রবাসে আয় সাধারণত দেশের তুলনায় বেশি হয়। কিন্তু আয় বেশি হলেই যে সঞ্চয় বেশি হবে, এমন নয়। অনেক প্রবাসী যে ভুলগুলো করেন:
ফলে ৫ বছর বিদেশে কাটানোর পরও হাতে উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় থাকে না।
প্রথমে বাজেট তৈরি করুন: প্রবাসে টাকা জমানোর উপায় খুঁজতে গেলে প্রথম ধাপ হলো বাজেট তৈরি করা। ধরুন আপনার মাসিক আয় ২,০০০ ডলার। তাহলে একটি সাধারণ বাজেট এমন হতে পারে:
আয় হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের অংশ আলাদা করে রাখুন। মাস শেষে যা বাঁচবে তা সঞ্চয় করব এই চিন্তা সাধারণত কাজ করে না।
আয় বাড়লে খরচ বাড়াবেন না: অনেকের বেতন ১,৫০০ ডলার থেকে ২,৫০০ ডলারে উঠলে প্রথম কাজ হয় নতুন ফোন কেনা। তারপর নতুন ঘড়ি। তারপর নতুন মোটরসাইকেল। তারপর মাস শেষে আবার একই অবস্থা! প্রবাসে টাকা জমানোর উপায়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর নিয়ম হলো আয় বাড়লে আগে সঞ্চয় বাড়ান, পরে জীবনযাত্রার মান বাড়ান।
প্রতিদিনের ছোট খরচ নিয়ন্ত্রণ করুন: অনেক সময় বড় খরচ নয়, ছোট ছোট খরচই সঞ্চয়ের শত্রু হয়। যেমন ধরুন প্রতিদিন ৫ ডলার অতিরিক্ত খরচ মাসে ১৫০ ডলার, বছরে ১,৮০০ ডলার! বাংলাদেশি টাকায় এটি ২ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে। তাই প্রতিটি খরচের হিসাব রাখা জরুরি।
আলাদা সেভিংস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করুন: প্রবাসে টাকা জমানোর উপায় হিসেবে অনেক অনেকে আলাদা সঞ্চয় অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কারণ এই কাজ করলে টাকা সহজে খরচ হয়ে যায় না, সঞ্চয়ের অগ্রগতি দেখা যায়, লক্ষ্য নির্ধারণ সহজ হয়! তাই বেতন পাওয়ার দিনই নির্দিষ্ট অংশ সেভিংস অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
ঋণ দ্রুত পরিশোধ করুন: অনেক বেশি সুদের ঋণ থাকলে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, ভোক্তা ঋণ! তাই প্রথমে এসব ঋণ কমানোর চেষ্টা করুন। ঋণের সুদ যত কমবে, সঞ্চয় তত দ্রুত বাড়বে।
দেশে টাকা পাঠানোর সঠিক পরিকল্পনা করুন: অনেক প্রবাসী পরিবারের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা পাঠিয়ে দেন। ফলে নিজের ভবিষ্যতের জন্য কিছুই জমাতে পারেন না। আমি জানি পরিবারকে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন: ভাই টাকা জমাবো এটা একটা ইচ্ছা। তবে দুই বছরে ১০ লাখ টাকা জমাব একটি লক্ষ্য। মনে রাখবেন লক্ষ্য যত স্পষ্ট হবে, সঞ্চয়ের সম্ভাবনা তত বাড়বে। যেমন ধরুন ১ বছরে ৫ লাখ টাকা, ৩ বছরে বাড়ির ডাউন পেমেন্ট, ৫ বছরে ব্যবসার মূলধন!
অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ খুঁজুন: শুধু খরচ কমানো নয়, আয় বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক প্রবাসী ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল মার্কেটিং বা অনলাইন টিউটরিং এর মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা আয় করছেন। কারণ অতিরিক্ত আয়ের পুরো অংশ সঞ্চয় করলে লক্ষ্য অনেক দ্রুত পূরণ হয়।
বন্ধুদের দেখাদেখি খরচ করবেন না: প্রবাসে অনেকেই অন্যদের জীবন দেখে নিজের খরচ বাড়িয়ে ফেলেন। কেউ নতুন ফোন কিনেছে। কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে। কেউ দামি ঘড়ি কিনেছে। কিন্তু আপনি জানেন না, এর পেছনে কত ঋণ বা আর্থিক চাপ রয়েছে। তাই অন্যের জীবন নয়, নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী খরচ করুন।
প্রবাসে টাকা জমানোর উপায় আসলে কোনো কঠিন কাজ নয়। নিয়মিত পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং ধৈর্যের ফল এটা! আপনি মাসে ১,০০০ ডলার আয় করুন বা ৫,০০০ ডলার, সঠিক অভ্যাস না থাকলে সঞ্চয় হবে না। তাই আজ থেকেই ছোট একটি পদক্ষেপ নিন। একটি বাজেট তৈরি করুন, মাসিক সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করুন। কয়েক বছরের মধ্যেই আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, ছোট ছোট সঞ্চয় একসময় বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে।